Logo
| বঙ্গাব্দ

নানা সমস্যায় জর্জরিত দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

  • আপডেট টাইম : 26-11-2025 ইং
  • 216991 বার পঠিত
নানা সমস্যায় জর্জরিত দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
রিপোর্টারঃ N/A

৫০ শয্যা বিশিষ্ট অসম্পূর্ণ ভবনের কাজ শেষ করে দ্রুত মানসম্মত চিকিৎসা সেবা চালু করার দাবি স্থানীয়দের।

জাকির হোসেন, দীঘিনালা

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার প্রায় সোয়া লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসাকেন্দ্র ১০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। নাজুক অবকাঠামো, জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ হাসপাতাল ভবন, প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় অধিবাসীদের চিকিৎসা সেবা।

সূত্রে জানা যায়, ১৯২৪ সালে নলখাগড়া, সিমেন্টের মিশ্রণ ও টিনের ছাউনি দিয়ে একটি ছোট ডিসপেনসারি স্থাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলে আধুনিক চিকিৎসাসেবার সূচনা হয়।

পরে ৮০'র দশকে এটিকে ১০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নীত করা হয়। এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৯–২০ অর্থবছরে হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প গ্রহণ করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। নতুন ভবন নির্মাণের দায়িত্ব পায় কেটি এমসি জেবি (কবির ট্রেডার্স ম্যাক কনস্ট্রাকশন)। চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও ছয় বছর পার হয়ে গেলেও এখনো ভবনের কাজ শেষ হয়নি। ফলে জরুরিভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন থেকে ইনডোর বেড সরিয়ে নতুন ভবনের নিচতলায় আংশিকভাবে রোগীদের ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৪৫ বছর আগে নির্মিত জরাজীর্ণ ভবনেই বহিঃর্বিভাগ ও জরুরি সেবা চলছে। ভবনের দেয়ালের সিমেন্ট-বালুর আস্তরণ খসে পড়েছে, টিনের ছাউনিতে মরিচা ধরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে ভেতরে পড়ে। এতে চিকিৎসকদের স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং রোগীরাও বাড়তি দুর্ভোগে পড়ছেন।


এলাকাবাসী ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে এসে তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাফি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরে না হওয়ায় এসব বাহিরের ক্লিনিকে করাতে হচ্ছে। একইভাবে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।

ফলে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। হাসপাতালের পর্যাপ্ত সেবা, যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অনেককে বাধ্য হয়ে জেলা সদরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় সাতজন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রতিদিন বহিঃর্বিভাগে ২শ থেকে ২শ ৫০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। জনবল সংকটের কারণে তিন শিফটেই এই তিনজন চিকিৎসককে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে ছোট বারান্দায় রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা এতে বেশি ভোগান্তির শিকার হন। আলাদা আলাদা বিভাগ না থাকায় গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সবার।

হাসপাতালে ১৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৭ জন, ৪৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। হাসপাতালটির ৪৪ জন মাঠকর্মীর বিপরীতে মাত্র ১৩ জন মাঠকর্মী রয়েছে। হাসপাতালটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট  হওয়ায় নেই মেডিসিন, সার্জারি, এনেস্থেসিয়া, চর্মরোগ ও শিশু বিশেষজ্ঞ এর মতো ডাক্তার। ফলে রোগীদের জটিল ক্ষেত্রে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি অনেক রোগী ঝুঁকিতে পড়ছেন। কেউ কেউ টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে অসুস্থতা নিয়েই দিন পার করছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে হার্ট, সার্জারি, ডায়বেটিস ও জটিল রোগের রোগীরা সবথেকে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী জেলা রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও লংগদু উপজেলা থেকে আসা রোগীদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটির।

হাসপাতালে এক্সরে সেবার জন্য টেকনোলজিস্ট থাকলেও প্রয়োজনীয় জায়গা ও বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ইকোকার্ডিওগ্রাফার নেই এবং ইসিজি মেশিন থাকলেও নেই টেকনোলজিস্ট। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এক্সরে মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। যার কারণে এসব সেবা পাচ্ছেন না হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা।

হাসপাতালের অসম্পূর্ণ নতুন ভবনের টয়লেটগুলো রোগী কেবিনের ঠিক পাশে হওয়ায় দুর্গন্ধে রোগী ও স্বজনরা নাজেহাল। ভর্তি থাকা ডেঙ্গু রোগী নবমিত্র চাকমা বলেন, তিনি তিন দিন ধরে ভর্তি আছেন, চিকিৎসা পেলেও টয়লেটের দুর্গন্ধে অসুস্থতা আরও বেড়ে যাচ্ছে মনে হচ্ছে।


বহিঃর্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সাহেরা বেগম বলেন, তিনি প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে চিকিৎসা পেয়েছেন, কিন্তু লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তার ব্যথা আরও বেড়েছে। দুই ধরনের ওষুধ পেলেও কিছু ওষুধ তাকে বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়েছে। ডাক্তার তাকে এক্সরে, ইসিজিসহ কিডনির পরিক্ষা করে রিপোর্ট দেখাতে বলেছেন। সাহেরা বেগম বলেন, পরিক্ষা করানোর মতো অর্থ ও সামর্থ্য কোনোটাই নেই আমার।

মেডিকেল অফিসার ড. কেচিং মারমা বলেন, জনবল সংকটের কারণে প্রত্যাশার তুলনায় বহুগুণ রোগী দেখতে হচ্ছে। যেখানে ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী দেখার কথা, সেখানে ২৫০- ৩০০ রোগী দেখতে হচ্ছে প্রতিদিন। ছোট একটি কক্ষে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ডেঙ্গু রোগী মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বেড সংকটের কারণে অনেক সময় পরিপূর্ণ  সুস্থ্য হওয়ার আগেই রোগীর সিট কেটে দিতে হয় নতুন রোগী ভর্তি করানোর জন্য।

নতুন ভবনের নির্মাণ কাজের বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (HPNSP) প্রকল্পের আওতায় ১০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ভবন নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুই বছরের মধ্যে ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ১০ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও মাত্র ৮৯ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে না পারায় ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অপারেশন মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হয়েছে এবং দুই মাসের মধ্যেই ভবনের বাকি অসম্পূর্ণ কাজ শুরু হওয়ার আশা রয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. তণয় তালুকদার বলেন, আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জনবল ও জায়গা না থাকায় মানুষের চিকিৎসা সেবার চাহিদা পূরণ করতে পারছিনা। ইনডোর বেডগুলো ঝুকিপূর্ণ ভবন থেকে সরিয়ে অসম্পূর্ণ ভবনের নিচতলায় ১৫ টি বেডে আমরা মানুষকে ভর্তি রেখে সেবা দিচ্ছি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সার্জারি সুবিধা, ওটি রুম এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির অভাবে অনেক জরুরি রোগীকে বাধ্য হয়ে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ৫০ শয্যার হাসপাতালের মান অনুযায়ী ওষুধ পাওয়া উচিত হলেও এখনো ১০ শয্যার হাসপাতালের বরাদ্দ অনুযায়ী ওষুধ পাই আমরা, ফলে মানুষকে আমরা সকল ওষুধ দিতে পারছিনা। আশা করি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন ভবনটি বুঝে পেলে এবং শূন্যপদগুলে পূরণ হলে এই উপজেলার লাখো মানুষকে মানসসম্মত চিকিৎসা ও সকল সেবা দিতে পারবো আমরা।

হাসপাতালের দুর্গন্ধের জন্য রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালে ৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বদলে মাত্র একজন রয়েছে। তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন, জনবল না থাকার কারণে ও মানুষের অসচেতনতার কারণে মাঝে মধ্যে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আশা করি দ্রুতই এই সমস্যার সমধান হবে।

খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো  ছাবের বলেন, দীঘিনালা স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির জন্য জনবল, ওষুধ সংকট ও নতুন ভবন নির্মাণ সহ বিভিন্ন বিষয়ে নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শীঘ্রই সকল সমস্যার সমধান হবে বলে আশা করছি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, সরকার যেন দ্রুত ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চালু করার ব্যবস্থা করে দেয় এবং খালি থাকা শূন্যপদগুলোতে জনবল নিয়োগ দেয়। দীঘিনালার মতো প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ যেন কোনো রকম ভোগান্তির শিকার না হয়ে আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে ভালভাবে বেচে থাকতে পারে সেই প্রত্যাশা সকলের।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ পার্বত্য পোস্ট | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায়