জাকির হোসেন
সম্প্রতি তিন দিনের কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যা কৃষকের জন্য একটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন হয়ে দাড়িয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী যে কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি হয়েছিল তাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় বোরো ধান, আম,কলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজিসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন হয়েছে। আর এতে চরম বিপাকে পড়েছে উপজেলার প্রান্তিক কৃষকেরা। কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের মনেও এখন নীরবে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, যে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ সোনালি ধানে ভরপুর ছিলো, সাপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কালবৈশাখীর তীব্রগতির ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টির কারণে বিস্তীর্ণ সেই সোনালি ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে গিয়েছে এবং কোথাও হেলে পড়ে মাটিতে মিশে আছে। আবার কোথাও কেটে রাখা ধান কৃষক ঘরে তুলার স্বপ্ন দেখছিলেন, সেই ধান পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এবং মাঠেই নষ্ট হয়েছে। আবার কেউ বুক সমান পানিতে দাড়িয়ে স্বপ্নের ফসল তুলার চেষ্টা করছে।
আম ও কলা পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছ গোড়া থেকে উপড়ে পড়েছে ও ফল ঝরে গিয়েছে। গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির ক্ষেত পানি জমে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। অসহায় কৃষক ফসলের মাঠ ও ফলের বাগানের পানে চেয়ে নীরবে চোখের জ্বল ফেলছে। আর এই কৃষকদের হাহাকারে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস।
দীঘিনালা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, সম্প্রতি কালবৈশাখী তান্ডবে দীঘিনালার প্রায় ১২.৫ হেক্টর বোরো ধানের জমি, ৮ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজি জমি, ১৫৭ হেক্টর আমের বাগান, ১৬৮ হেক্টর কলা বাগান ও অন্যান্য ৫ হেক্টর জমি সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি অফিস জানায়, বোরো ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষতির পরিমাণ এখনো টাকার অংকে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রাথমিক হিসেবে আমের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, কলায় ৮৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ফসলে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। বোরো ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষতির টাকার অংক নির্ধারণ করা সম্ভব হলে কালবৈশাখী ঝড়ে দীঘিনালায় ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আর এতে সবছেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের বোরো ধান চাষি কৃষকেরা। তারা জানায়, দীর্ঘদিন ধরে ধান চাষ করে মোটামুটি খরচ তুলতে পারলেও লাভের মুখ দেখেন না। কৃষি তাদের নেশা আর পেশা হওয়ায় ভালবেসে ধার দেনা করে হলেও সোনালি ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু সেই স্বপ্বের ফসল কাল বৈশাখীর হানায় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। উল্টো ঋনের বোঝাও ভারি হয়ে পড়েছে।
উপজেলার মধ্যবোয়ালখালি এলাকার ধান চাষি মো. আবু তালেব জানান তার তিন কানি জমির কেটে রাখা ধান চলমান দূর্যোগে পানিতে ডুবে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে করে মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির মুখে পরেছেন বলে জানান তিনি।
উপজেলার দীঘিনালা ইউনিয়নের কলা চাষি শান্তি প্রিয় চাকমা বলেন, আমি ঋণ করে ৩ একর জমিতে কলা চাষ করেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন আগের কালবৈশাখী ঝড়ে আমার বাগানের অপরিপক্ক কলাগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং সকল গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। আমি অসহায় হয়ে পড়েছি।
বোয়ালখালি ইউনিয়নের প্রিয়দর্শী চাকমা জানান, আমি ঋণ নিয়ে ৭ একর জমিতে দেশি বিদেশি বিভিন্ন জাতের আমের বাগান রয়েছে। কালবৈশাখীর তীব্র ঝড়ে ১০০-১৫০ গাছ গুড়া থেকে উঠে গিয়েছে ৩ ভাগের ২ ভাগ আম ঝড়ে পড়েছে।
দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে দীঘিনালায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছি,এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খোঁজ খবর রাখছি। চলমান দূর্যোগে ঝড়-বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে শুধু ফসলই নয়, কৃষকের মনেও বয়ে যাচ্ছে এক নীরব ঝড়। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—কৃষকের এই কালবৈশাখী ঝড় কে থামাবে?
এ জাতীয় আরো খবর..